ফুলতলীর প্রভাব উপেক্ষা করে না কেউ
আধ্যাত্মিকতা আর রাজনীতির এক বিরল সম্মিলনে পরিণত হয়েছে ফুলতলী। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর ১৮তম ঈসালে সাওয়াব মাহফিলকে কেন্দ্র করে এবার শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নয়, স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের সরব ও নীরব উপস্থিতি। এক দিনের জন্য ফুলতলীর ফুলবাগান যেন রূপ নিয়েছে নির্বাচনী রাজনীতির এক নীরব কূটনৈতিক মাঠে।দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেম-উলামা ও বুযুর্গদের সঙ্গে কাতারে কাতারে বসেছেন বিএনপি, জামায়াত, জমিয়ত, খেলাফত মজলিস, জাতীয় পার্টি, আনজুমানে আল-ইসলাহসহ বিভিন্ন দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। উদ্দেশ্য খুব একটা গোপন নয়—ফুলতলী দরবারের মুরীদিন ও মুহিব্বিনদের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। রাজনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘ভোটের মধু আহরণ’।
মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মনোনীত সিলেট-৩ আসনের প্রার্থী এম এ মালেক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সুনামগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী, খেলাফত মজলিস মনোনীত সিলেট-৫ আসনের (জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট) প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী ও বরুণা পীর ছাহেবের নাতি শেখ নুরে আলম হামিদী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান, আনজুমানে আল-ইসলাহ মনোনীত মৌলভীবাজার-১ আসনের প্রার্থী মুফতি মাওলানা বেলাল আহমদ, মৌলভীবাজার-২ আসনের কাজী ফজলুল হক খান সাহেদ, মৌলভীবাজার-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা হাজী মুজিব, সিলেট-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন, এনসিপি মনোনীত সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মুস্তাকিম রাজা চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী জমিয়ত নেতা হাফিজ মাওলানা ফখরুল ইসলাম। আরও অনেক প্রার্থী দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ে আসতে পারেননি।।
মাজার জিয়ারত, ঈসালে সাওয়াব মাহফিলে অংশগ্রহণ, ফুলতলী ছাহেব বাড়ির পরিবেশে নীরব অবস্থান সবকিছু মিলিয়ে প্রার্থীদের আচরণে ছিল এক ধরনের হিসাবি সংযম। প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না থাকলেও প্রতিটি উপস্থিতিই ছিল সুস্পষ্ট বার্তাবাহী, যেন ফুলতলী মসলকের অনুসারীদের কাছে ভুল কোনো সংকেত না যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মাহফিল কার্যত দেখিয়ে দিয়েছে বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতিতে ফুলতলীর প্রভাব কতটা গভীর ও কার্যকর। আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন দলের প্রার্থীদের একই ময়দানে হাজির হওয়াই তার বড় প্রমাণ। কেউ এসেছেন সমর্থন আদায়ে, কেউ এসেছেন দূরত্ব কমাতে, আবার কেউ শুধু বিরূপ না হওয়ার বাস্তব কৌশল হিসেবেই উপস্থিত থেকেছেন।
গতদিনের আলোচিত প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় বলা যায়, এবারের ফুলতলীর ঈসালে সাওয়াব মাহফিল নির্বাচনী রাজনীতির এক অঘোষিত সূচনা মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ভোটের মাঠে আনুষ্ঠানিক লড়াই শুরুর আগেই অনেক প্রার্থী এখানেই নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছেন। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে; বৃহত্তর সিলেটের নির্বাচনী সমীকরণে ফুলতলী একটি ‘বিগ ফ্যাক্টর’, যাকে উপেক্ষা করে কোনো হিসাবই পূর্ণতা পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে মাহফিলের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন এই কাফেলার প্রাণপুরুষ আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর ছাহেবজাদা ও আনজুমানে আল-ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। দীর্ঘ নীরবতার পর চিরচেনা প্রিয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য যেন লাখো ছাত্র–জনতার অন্তরে নতুন করে সঞ্চার করে দেয় আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার বার্তা।
বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমরা দমে যাইনি, বরং দ্বিগুণ শক্তি সঞ্চারিত করেছি। ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনে হাজার বার রাস্তায় নামতে প্রস্তুত আছি।”
তিনি স্পষ্ট করে দেন, আনজুমানে আল-ইসলাহ কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের পতাকাবাহী, আল্লাহর ওলীর হাতে গড়া একটি মকবুল সংগঠন। দুনিয়া ও আখেরাত দুটোরই কাজ একসঙ্গে চলবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা গদির জন্য রাজনীতি করিনি। এবারের নির্বাচনে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে শতভাগ পাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা গিয়েছিলাম দ্বীনের খেদমতের জন্য। প্রয়োজনে আরও শতবার যেতে প্রস্তুত আছি।”
তালামীয ও আল-ইসলাহ প্রসঙ্গে মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “মিথ্যা ট্যাগ না দিয়ে পারলে আমাদের সঙ্গে আদর্শিকভাবে পাল্লা দিয়ে মুকাবিলা করেন।”
নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নিজে, কাজী সাহেদ খান, মাওলানা বেলাল আহমদ কিংবা মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ফারুকী—সবাই চাইলে স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াতে পারেন। যোগ্যতা থাকলে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন তিনি।
মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রসঙ্গে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “আমার কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে আর যদি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়, এক মামলার জবাবে আমরা শত মামলা দায়ের করাতে পারবো।”
এছাড়া বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি জানান, দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফোন করে আপনাদের সালাম জানিয়েছেন, যা উপস্থিত জনতার মধ্যে বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
এসময় আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে কোণঠাসা করার চক্রান্তের প্রতিবাদে যে আন্দোলন তারা শুরু করেছিলেন এবং যার পেছনে বিপুল ত্যাগ ও কুরবানী রয়েছে, সেই ন্যায্য দাবিগুলো আজও পূরণ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান শিক্ষা কারিকুলামে সমকামিতাসহ এমন সব বিষয় সংযোজন করা হয়েছে যা স্পষ্টভাবে ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে আবারও রাজপথে নামার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন বলে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মাহফিল কার্যত দুটি দীর্ঘদিনের বিতর্কের ইতি টেনেছে। প্রথমটি ছিল হযরত মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর অতীত নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সে সময় জাতি ছিল এক গভীর সংকটের মুখে। পাঠ্যপুস্তকে ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী বিষয় সংযোজন, মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা—এই বাস্তবতায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনেই নেওয়া একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত ছিল।
দ্বিতীয় বিতর্কটি ছিল ঈসালে সাওয়াব মাহফিলকে ঘিরে। একসময় যারা এটিকে বিদআত বলে বিরোধিতা করতেন, তাঁরাই এবার দল-মত নির্বিশেষে এই মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, উপস্থিতি মানেই এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি—এই আয়োজন শরিয়তবিরোধী নয়, বরং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।
তাঁদের মতে, এবারের ঈসালে সাওয়াব মাহফিল শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি বৃহত্তর সিলেটের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের ইঙ্গিত। যেখানে ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি এসে মিলেছে একই বিন্দুতে। সময়ের প্রবাহে এখান থেকেই নতুন অনেক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।