সাপ্তাহিক সবুজ প্রান্ত

পরিবার প্রথার অবক্ষয় ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বসমাজ এক গভীর পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত আধুনিক সমাজ আজ নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ে জর্জরিত। মানবিক মূল্যবোধের অবনতি এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতাই এর মূল কারণ।

একসময় পরিবার ছিল সমাজের স্থিতিশীলতা, সভ্যতা ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি। বিবাহ বন্ধন ছিল পাপপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যূহ। কিন্তু আজ এই পরিবার প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়ছে। নীতি, লজ্জা ও মানবতা হারিয়ে সমাজ ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।

জনৈক সমাজবিজ্ঞানীর ভাষায়—“বিংশ শতাব্দির প্রথম পঁচিশ বছরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যুদ্ধ নয়, রুশ বিপ্লবও নয়; নারী জাতির মর্যাদার পরিবর্তনই ছিল সেই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।”

নারী স্বাধীনতা ও পরিবার সংকট

তথাকথিত নারী স্বাধীনতা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পারিবারিক পরিবেশকে কলুষিত করেছে। নারীরা স্বভাবজাত দায়িত্ব ভুলে প্রতিযোগিতায় নেমেছে পুরুষের সঙ্গে, আর এর পেছনে তথাকথিত প্রগতিশীল পুরুষের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না।

মাতৃত্ব ও সন্তানধারণ নারীর প্রাকৃতিক দায়িত্ব। কিন্তু আধুনিক সমাজে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ ও অবাধ সম্পর্কের সংস্কৃতিতে কুমারী মাতৃত্বের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। নারী তার কোমলতা হারাচ্ছে, আর এর সঙ্গে সঙ্গে পরিবার হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক উষ্ণতা ও বন্ধন।

ফলে মানবজীবনে নেমে এসেছে অস্থিরতা, একাকীত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা। আধুনিক সমাজ আজ যে অনৈক্য ও মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে পারিবারিক সংহতির ভাঙন।

গ্রীক ও রোমান সভ্যতার শিক্ষা

প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। প্রথমদিকে নারীরা সেখানে অবমানিত হলেও পরবর্তীতে তারা গৃহকর্ত্রীর মর্যাদা লাভ করে, সতীত্বকে পবিত্রতা হিসেবে গণ্য করা হতো। এই পারিবারিক সংহতিই গ্রীক জাতিকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়।

কিন্তু উন্নতির চরমে পৌঁছে তারা যখন নৈতিকতা বিসর্জন দিল—তখনই শুরু হলো পতন। ব্যভিচার, বিলাসিতা, যৌন উদারতা সমাজকে গ্রাস করে নিল। ফলাফল—গ্রীক সভ্যতার ধ্বংস।

একই ইতিহাস রোমান সভ্যতারও। একসময় রোমান সমাজে পারিবারিক বন্ধন ছিল দৃঢ়, নারী-পুরুষের দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট। কিন্তু বিলাস-ব্যসন, মদ, জুয়া ও ভোগবিলাস তাদের পরিবার ভেঙে দিল। নারীর অবাধ স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক প্রাধান্য ও তালাকের ছড়াছড়িতে পরিবার প্রথা ধ্বংস হয়ে যায়।

একজন ইতিহাসবিদ লিখেছেন, “রোমান নারীরা তাদের স্বামীর সংখ্যা দ্বারা নিজেদের বয়স গণনা করত।” এই নৈতিক অবক্ষয়ই রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ।

আধুনিক সমাজে একই প্রবণতা

আজকের তথাকথিত আধুনিক সভ্যতাও সেই একই পথে হাঁটছে। প্রযুক্তি, ফ্যাশন ও তথাকথিত স্বাধীনতার নামে পরিবার হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু। শিশু বড় হচ্ছে ছিন্নমূল পরিবেশে; ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গা নিচ্ছে স্বার্থ ও ভোগের প্রতিযোগিতা।

তবু আশার কথা—মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতের জটিল ও সংকটময় জীবনে মানুষ আবার পরিবারের উষ্ণতায় ফিরতে বাধ্য হবে। পরিবারই তাকে দেবে নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও মানসিক শান্তি।

আমেরিকার এফবিআই-এর সাবেক পরিচালক এডগার জে. হুভারের ভাষায়,

“মার্কিন জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিশীলিত পারিবারিক পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে।”

 আজ আমাদেরও একই উপলব্ধি জরুরি—

পরিবার শুধু একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানবসভ্যতার ভিত্তি, নৈতিকতার আশ্রয় এবং সংস্কৃতির ধারক। পরিবার টিকলে সমাজ টিকে থাকবে, আর সমাজ টিকলে টিকে থাকবে মানবতা।


লেখক : 

সম্পাদক ও প্রকাশক, সাপ্তাহিক সবুজ প্রান্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতরপূর্বতন